যোগাযোগ কি । বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে যোগাযোগের সংজ্ঞা

যোগাযোগ কি বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে যোগাযোগের সংজ্ঞা

যোগাযোগ কী 


ইংরেজি Communication শব্দ টির বাংলা প্রতিশব্দ হলো যোগাযোগ। Communication শব্দটি ল্যাটিন Communis থেকে এসেছে। যার অর্থ হল সাধারণ।

যখন দু জন বা তার বেশি লোক পরস্পর কথা বলে তখন তাকে যোগাযোগ বলে। তবে যোগাযোগ কে সংজ্ঞায়িত করতে সংজ্ঞা টি যথেষ্ট নয় যোগাযোগ শব্দটি একটি বিভ্রান্তিকর শব্দ। একেক ব্যক্তি ভিন্ন ভাবে এবং বিভিন্ন অর্থে শব্দটি ব্যবহার করেন।


যোগাযোগ হচ্ছে এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে আমরা আমাদের চিন্তা, অনুভূতি, ধারণা, অভিজ্ঞতা ইত্যাদি একে অপরের সাথে আদান-প্রদান করি। তাই,সাধারণত অন্য কারো সাথে যোগাযোগ করার পূর্বে আমরা কিভাবে কথা বলব, কি বলব, কখন বলব, যোগাযোগের সময় কি ধরণের মাধ্যম ব্যবহার করা উচিৎ, কীভাবে এটিকে ফলপ্রসূ করা যায়, এর বিপরীতে কি ধরণের প্রতিক্রিয়া(Feedback) দেখতে হবে ইত্যাদি বিষয় নিয়ে চিন্তিত থাকি। ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির সাথে আমরা ভিন্নভাবে যোগাযোগ করে থাকি। যোগাযোগ প্রক্রিয়াও ভিন্ন হয়।

তাই, যোগাযোগের ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট সংজ্ঞা কিংবা ব্যাখ্যা অনুসরণ করার প্রয়োজন নেই। এটিকে আমাদের বিশ্বাস বা জ্ঞানের আলোকেই ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। যোগাযোগ প্রক্রিয়ায়, গ্রাহক (sender), প্রেরক (receiver), বার্তা (message), ফলাবর্তন (feedback)  ইত্যাদি প্রত্যেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যাদের প্রত্যেকের আলাদা ভূমিকা অর্থ (meaning) রয়েছে।

 

বস্তুত, আমাদের আমাদের জীবনে যোগাযোগ প্রক্রিয়ার কখনও সমাপ্তি ঘটে না। আমরা আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই যোগাযোগ করে থাকি। এমনকি, সৃষ্টিকর্তার প্রতি আমাদের বিশ্বাসও এক ধরনের যোগাযোগ। যখন কোন একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে যোগাযোগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়, তখন তার একটি ইতিবাচক বা নেতিবাচক ফলাফল লক্ষ্য করা যায়। যোগাযোগ প্রক্রিয়ায়ভাব’ (idea) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

অর্থবোধক ভাব ব্যতীত কারও সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব নয়। তাই আমাদের মনোজগতে নতুন এমন সব ধারণার (idea)  চর্চা করতে হবে যেন তা অন্যকে সফলভাবে প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়। যোগাযোগ কি , সাধারণ অর্থে যোগাযোগ হলো তথ্য আদান-প্রদানের উপায়। মানুষ থেকে মানুষ বা যন্ত্র থেকে যন্ত্রে তথ্য আদান প্রদান হতে পারে। তবে আমরা এখানে মানবীয় যোগাযোগ সম্পর্কে আলোচনা করব।

 

যোগাযোগের সংজ্ঞা Definition of communication

যোগাযোগের ক্ষেত্রে কী ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে, এটি তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। যোগাযোগের প্রতিটি ক্ষেত্রেই একটি বার্তা (message) থাকতে হবে, যা উৎস (sender) হতে গন্তব্যের (receiver)  দিকে পৌঁছাবে।

ফলপ্রসূ যোগাযোগের জন্য উৎস (sender)   প্রাপক (receiver) উভয়ের মাঝেই কিছু সাধারণ শব্দ বা সংকেত থাকতে হবে যেন প্রেরিত বার্তার অর্থ (meaning)  স্পষ্ট বোঝা যায়। যোগাযোগের আদর্শ সংজ্ঞা (definition) বলতে, অংশগ্রহণকারী দুটি পক্ষের মধ্যে তথ্য আদন-প্রদানের পারস্পরিক মিথষ্ক্রিয়া বোঝাপড়াকে বোঝায়। উভয়পক্ষের মধ্যে সংঘটিত মিথষ্ক্রিয়াকে তখনই আদর্শ যোগাযোগ বলা যাবে, যখন সেখানে একটি আলোচনার ব্যবস্থা থাকবে এবং পুনঃউত্তরের মাধ্যমে সে বার্তাটির যথার্থতা মূল্যায়ণের সুযোগ থাকবে।

অন্যান্য সংজ্ঞা (reference):

যোগাযোগ হলো এক ব্যক্তি হতে অন্যের নিকট তথ্যের আদান-প্রদান, হোক সেটা বিশ্বাসযোগ্য বা অবিশ্বাসযোগ্য, কিন্তু সেটা অবশ্যই বোধগম্য হতে হবে।
G. G. Brown

যোগাযোগ হলো শব্দ, বর্ণ বা বার্তার সামাজিক আদান-প্রদান।
Fred. G. Meyer

উপরের সংজ্ঞাগুলো পর্যালোচনা করে এটি স্পষ্টভাবে দেখা যায় যে, যোগাযোগের প্রতিটি ক্ষেত্রে একটি বার্তা থাকে যা গন্তব্যের (receiver)  নিকট প্রেরিত হয়।


বিভিন্ন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞসমাজবিজ্ঞানী দার্শনিক তাঁদের দৃষ্টিকোণ থেকে যোগাযোগ বিষয়টি সংজ্ঞিত করার চেষ্টা করেছেন। কেউ যোগাযোগ কে মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ কেউবা সামাজিক দৃষ্টিকোণ আবার কেউবা প্রক্রিয়াগত দৃষ্টিকোণ থেকে যোগাযোগকে সংজ্ঞায়িতকরেছেন।


মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে যোগাযোগের সংজ্ঞা 

গ্রিক দার্শনিক প্লেটো বলেন,

Rhetoric is the winning of men’s minds by words.

প্লেটোর যুগে যোগাযোগ Rhetoric নামে অভিহিত হত।

দার্শনিক অ্যারিস্টটল এর মতে,

Communication is the search for all the available means of persuasion.

.
প্রক্রিয়াগত দৃষ্টিকোণ থেকে যোগাযোগের সংজ্ঞা 

মনোবিজ্ঞানী কার্ল হোভল্যান্ড বলেন,

 যোগাযোগ এমন এক প্রক্রিয়াযার মাধ্যমে একজন অন্যের আচরণপরিবর্তনের উদ্দেশ্যে উদ্দীপক(বাচনিক সংকেত) পাঠায়।

উইলবার শ্রাম এর মতে

The process of sharing information and the relationship of the participants in the process – we call communication.

.

সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে যোগাযোগের সংজ্ঞা 


K.K. Sereno এবং C.D. Mortensen এর মতে,


Communication is a process by which senders and receives of the messages interact in a given  social context.

Y.V. Lakshmana Rao বলেন

Communication refers to a social process -the flow of information, the circulation of ideas in human society, and the propagation and internalization of thoughts.

সুতরাং, বার্তা প্রেরণের জন্য এটিকে নির্দিষ্ট কোন ভাষার নির্দিষ্ট কোন শব্দ হতে হবে এমন কোন কথা নেই। পাঠকের বোধগম্য হয় এমন কোন সংকেতও বার্তা হতে পারে। বার্তা কেবল একজনের জন্য নয়। এখানে দুটি পক্ষ থাকতে হবে যেখানে একজন প্রেরক অপরজন প্রাপকের ভূমিকা পালন করবে। যোগাযোগে, উভয় পক্ষের পারস্পরিক বোঝাপড়া ভালো ফলাফল বয়ে আনতে পারে।

এখানে বোঝাপড়া বলতে, প্রাপকের দ্বারা উৎস থেকে প্রেরিত বার্তার যথার্থ মূল্যায়ণকে বোঝানো হয়েছে- যা ফলপ্রসূ যোগাযোগকে ত্বরান্বিত করবে।

যোগাযোগ প্রক্রিয়ার শেষাংশ নির্ভর করবে প্রাপকের উপর, তিনি যদি বার্তাটিতে সন্তুষ্ট না হন তাহলে উৎসের সাথে মতবিনিময় করবেন তাই, বলা যায়, এই মতবিনিময় প্রক্রিয়াটিই ফলপ্রসূ যোগাযোগের প্রতিনিধিত্ব করে, যোগাযোগকে কার্যকর বা অকার্যকর করে। তাই, উৎস যখনই ভাবের উৎপাদন করে, তখনই তাকে এটিকে বার্তায় রূপ দেওয়ার সময় এমন কিছু দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে যা অপরপক্ষের তথ্য প্রাপকের নিকট যথার্থ বোধগম্য করে তোলে।

Reference :

Human Communication – Joseph A. DeVito

Essentials of Human Communication – Joseph A. DeVito

No comments

Powered by Blogger.